কচুয়ার দারাশাহী তুলপাইয়ে ৩শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হযরত দারাশাহ (রহ.) মসজিদ ও মাজার
বিশেষ প্রতিনিধি ॥
কচুয়া উপজেলার পশ্চিম সহদেবপুর ইউনিয়নের তুলপাই গ্রামের পাটওয়ারী বাড়িতে অবস্থিত হযরত দারাশাহ (রহ.)এর মাজার ও মসজিদ প্রায় তিনশত বছরের ইতিহাস,ঐতিহ্য ও ধর্মীয় স্মৃতির সাক্ষ্য বহন করে আসছে। কারুকার্য খঁচিত প্রাচীনতম হযরত দারাশাহ (র:) মসজিদ, মাজার, গাউছিয়া দারাশাহী ওয়াদুদিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা,পুরোনো পারিবারিক কবরস্থান এবং জমিদার বাড়ির জরাজীর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনাকে ঘিরে এলাকাটি আজও ধারণ করে আছে অতীতের নানা স্মৃতি। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য মানুষ মাজার জিয়ারত করতে এখানে আসেন।
স্থানীয় সূত্রে ও হযরত দারাশাহ (র:)মসজিদের সভাপতি বিশিষ্ট সমাজ সেবক মো: আজিজুর রহমান পাটওয়ারী জানান,৩শত বছর আগে বিশিষ্ট আলেম হযরত দারাশাহ (রহ.) ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আগমন করেন। তিনি প্রথমে বর্তমান মসজিদ সংলগ্ন দীঘির উত্তর পারে বড় একটি গাছের নীচে আস্তানা গেড়ে ইসলাম প্রচারের জন্য এই এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তখন এই এলাকায় জনবসতি অনেক কম ছিল। তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য বিভিন্ন এলাকার মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে ধর্ম প্রচারে কাজ করতেন। ইসলাম প্রচারের জন্য দারাশাহ (র:)মতলব দক্ষিণ উপজেলার কাশিমপুর এলাকা দিয়ে যাতায়তের সময় কাশিমপুর এলাকার জমিদার হরদয়াল নাগের সুন্দরী কন্যা রামেশ্বর দেবী দারাশাহ (র:) সুদর্শন চেহারায় আকৃষ্ট হয়ে তার বাবার আদেশ অমান্য করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে হযরত দারাশাহ (রহ:)এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নাম পরিবর্তন করে শেখ দারা রামেশ্বরী দেবী রেখে হযরত দারাশাহ (রহ) এর সাথে দারাশাহী তুলপাই গ্রামে বসবাস শুরু করেন। জমিদার হরদয়াল নাগ ভবিষ্যতের জন্য তার কন্যা শেখ দারা রামেশ্বরী দেবীকে তুলপাইসহ তৎসংলগ্ন এলাকার জমিদারী লিখে দেয়। হযরত দারাশাহ( র:) ছিলেন ১ ছেলে বদিউজ্জামান চৌধুরী।বদিউজ্জামান চৌধুরীর ছিল এক ছেলে নুরুজ্জামান চৌধুরী। নুরুজ্জামান চৌধুরীর ছেলে আশরাফুজ্জামান ও আক্রামুন নেছাসহ ৩ কন্যা সন্তান রেখে যান। পরবর্তীতে দোগর চৌধুরী বাড়িতে আকরামুন্নেসার বিয়ে হয়।
মৃত্যুর পর তাঁর বংশধর নুরুজ্জামান চৌধুরী ১৭৮৭ সালে স্মৃতিবিজড়িত কারুকার্য খঁচিত দারাশাহ (রহ.) মসজিদটি নির্মাণ করেন।তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে তুলপাই গ্রামের ঐতিহ্যবাহী দারাশাহ (র:) মসজিদ ও মাজার।স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হযরত দারাশাহ (রহ.)-এর বংশধর এবং প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর এই মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। মসজিদের পাশেই রয়েছে হযরত দারাশাহ (রহ.)-এর মাজার। আরো জানা যায় কাদলা ইউনিয়নের দোঘর চৌধুরী বাড়ির পূর্বপুরুষগণ দারাশাহ (র:) বংশধর। জমিদারি দেখাশোনা করতে তাঁর বংশধরগন তুলপাই জমিদার বাড়িতে বসবাস করেতেন। দোগর চৌধুরী বাড়িতে বংশধরগনের তুলপাই বাজার ও মসজিদ সংলগ্ন এলাকার এখনও অনেক সম্পত্তি রয়েছে।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে, প্রায় ৩শত বছর আগে হযরত দারাশাহ (রহ.) এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছিলেন। তাঁর স্মৃতি বহন করছে এখানকার মসজিদ ও মাজার। প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ মাজার জিয়ারত করতে আসেন। অনেকে আল্লাহর কাছে দোয়া করার উদ্দেশ্যে এখানে আসেন এবং মানত করেন। প্রতি শুক্রবার বাদ জুমা হযরত দারাশাহ (র) মসজিদে মুসল্লীদের মনের বাসনা বা মনতের শিরনি পরিবেশন করা হয়।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, কবর বা মাজারে সিজদা করা গ্রহণযোগ্য নয়।তাই মাজার জিয়ারতকারীদের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে মাজার জিয়ারত করার চলার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি বলে মসজিদের খতিব জানান।
প্রতিবছর ৩০শে আগস্ট দরাশাহ (র:) জন্মদিন উপলক্ষে মধ্যরাত পর্যন্ত মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
তাছাড়া প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার বার্ষিক ওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। বার্ষিক মাহফিলে দেশবরেণ্য বিশিষ্ট আলেমগণ হেদায়তের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান করেন। ভোরবেলা আখেরি মোনাজাতের পর তবারক বিতরণের মাধ্যমে বার্ষিক মাহফিল সম্পন্ন হয়।
হযরত দারাশাহ (র:) মসজিদ ও মাজার সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে তুলপাই পাটোয়ারী বাড়ির প্রাচীনতম পারিবারিক কবরস্থান। সেখানে প্রয়াত জাহাবক্স পাটওয়ারীসহ অন্যান্য আওলাদগনের বা পূর্বপুরুষদের সমাহিত করা হয়েছে। কবরস্থানটি অতীত প্রজন্মের স্মৃতি ও পাটওয়ারী বাড়ির পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
ছবি : হযরত দারাশাহ (র:)মাজারের অংশ বিশেষ ।
হযরত দারাশাহ ( র:)মসজিদ, মাজার ও পাটওয়ারী বাড়ির কবরস্থান, জমিদার বাড়ি এই স্থাপনাকে ঘিরে তুলপাই পাটোয়ারী বাড়ি এলাকায় গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী এক পরিবেশ। দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থাপনা স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও ঐতিহাসিক স্মৃতির অংশ হয়ে রয়েছে।
তুলপাই পাটোয়ারী বাড়ি এলাকায় রয়েছে একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয় শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরী ও কুরআন হাফেজ হওয়ার তৈরী সুযোগ হয়েছে। পাশাপাশি এলাকায় বিভিন্ন ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এছাড়া প্রতি মাসেও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রয়েছে।
তুলপাই পাটোয়ারী বাড়ির ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর কাছেই রয়েছে ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ির একটি প্রাচীন পরিত্যক্ত ভবন। স্থানীয়দের ধারণা, প্রায় ৩০০ বছর আগে হযরত দারাশাহ (রহ.)-এর পূর্বপুরুষ আশরাফ আলী চৌধুরী তুলপাই জমিদার বাড়িতে সৌন্দর্যমন্ডিত ভবন নির্মাণ করে জমিদারি দেখাশোনা করতেন। জমিদারি পরিচালনা ও ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে হযরত দারাশাহ (রহ.)-এর বংশধরেরা তুলপাই এলাকায় বসবাস করতেন বলেও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
ছবি: / তুলপাই জমিদার বাড়ি
একসময়ের স্মৃতিবিজড়ি জমিদার বাড়ির ভবনটি বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ভবনের বিভিন্ন অংশ ধসে পড়ছে।দেয়াল ও অন্যান্য অংশে জন্মেছে গাছপালা। দীর্ঘদিনের অযতœ ও অবহেলায় ভবনটি ক্রমেই তার অস্তিত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে।
স্থানীয়দের মতে, ভবনটি শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি এলাকার অতীত ইতিহাস, সামাজিক অবস্থান ও ঐতিহ্যের স্মারক।
তুলপাই গ্রামের হযরত দারাশাহ (রহ.)-এর মসজিদ ও মাজার, ফোরকানিয়া মাদ্রাসা এবং গাউছিয়া দারাশাহী ওয়াদুদিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা ,ফোরকানিয়া মাদ্রাসা এবং আশ্রাফ আলী জমিদার বাড়ির প্রাচীন স্থাপনা সব মিলিয়ে এলাকাটি কচুয়ার ধর্মীয়, সামাজিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দীর্ঘদিনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ করে থাকা এসব স্থাপনা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জমিদার বাড়ির জরাজীর্ণ ভবনটির অবস্থা পর্যালোচনা করে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিরূপণ করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ,পুরোনো দলিলপত্র অনুসন্ধান এবং স্থাপনাগুলোর ইতিহাস লিখিতভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার বহু প্রাচীন স্থাপনা হারিয়ে যাচ্ছে। যথাযথ উদ্যোগের অভাবে দারাশাহী তুলপাইয়ের ঐতিহাসিক ভবনটিও একসময় বিলীন হয়ে যেতে পারে। তাই হযরত দারাশাহ (রহ.)-এর মাজার ও মসজিদসহ সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করা গেলে তা কেবল স্থানীয় ঐতিহ্য রক্ষায় নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কচুয়ার সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই ইতিহাসের অংশ শতাব্দীর সাক্ষ্য বহনকারী দারাশাহ (র:) মাজার, মসজিদ ও জমিদার বাড়িটি সংরক্ষণ করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি হবে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
প্রসঙ্গত :তুলপাই গ্রাম ও বাজার এলাকায় হযরত দারাশাহ (র:)এর নামে মসজিদ,মাদ্রাসা ও একটি উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। যা শতাব্দীর পর শতাব্দী দারাশাহ( র:)স্মৃতি বহন করে চলছে।
তথ্য সংগ্রহ : মো: আজিজুর রহমান পাটওয়ারী ,সভাপতি ও মোতওয়াল্লী, হযরত দারাশাহ (র:) জামে মসজিদ।
Leave a Reply