বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ৩২ বছরের গৌরবগাঁথা পেরিয়ে ৩৩ বছরে চাঁদপুর কণ্ঠ
পাঁচতলা ‘চাঁদপুর কণ্ঠ কমপ্লেক্স’ নির্মাণের ঘোষণা;
নীতি ও সত্যের প্রশ্নে কখনো আপস নয় — অ্যাডভোকেট ইকবাল বিন বাশার
আব্দুল্লাহ আল মামুন:
‘বস্তুনিষ্ঠতায় আমাদের মূলনীতি, পাঠকপ্রিয়তায় আমাদের মূলধন’— এই অঙ্গীকারকে ধারণ করে দীর্ঘ ৩২ বছরের পথচলা অতিক্রম করে ৩৩ বছরে পদার্পণ করল চাঁদপুরের গণমানুষের আস্থার প্রতীক দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ। বুধবার (১৭ জুন) পত্রিকাটির ৩২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে চাঁদপুর কণ্ঠ পরিবারের উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে চাঁদপুর প্রেস ক্লাবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জেলার আটটি উপজেলার প্রতিনিধিসহ পত্রিকার বিভিন্ন বিভাগের সাংবাদিক ও লেখক উপস্থিত ছিলেন। সকাল থেকে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটি বিকেল পর্যন্ত এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়। আলোচনা সভা, স্মৃতিচারণ, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা, কেক কাটা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় চাঁদপুর কণ্ঠের গৌরবময় এই অর্জন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের প্রতিষ্ঠাতা, সম্পাদক ও প্রকাশক অ্যাডভোকেট ইকবাল বিন বাশার বলেন, “মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা ৩২ বছরের দীর্ঘ পথচলা সফলভাবে অতিক্রম করতে পেরেছি। এই যাত্রাপথ মোটেও সহজ ছিল না। সত্য প্রকাশের কারণে নানা সময়ে নানা প্রতিকূলতা, চাপ ও ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু আমরা কখনো নীতির প্রশ্নে আপস করিনি।”
তিনি বলেন, চাঁদপুর কণ্ঠ প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাঠকের আস্থা অর্জন করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার না করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে পত্রিকাটি আজ জেলার মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “দুর্নীতির মাধ্যমে সাময়িকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। আমরা অনেক বড় বড় প্রলোভন ও সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছি শুধুমাত্র আমাদের নীতি ও আদর্শ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য। যদি আপস করতাম, তাহলে হয়তো অনেক আগেই বিশাল সম্পদের মালিক হতে পারতাম। কিন্তু আমরা মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাসকে সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেছি।”
চাঁদপুর কণ্ঠের শুরুর সময়কার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি সাংবাদিক কাজী শাহাদাত ও মির্জা জাকিরের অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে পত্রিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল সহকর্মী, প্রতিনিধি ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে অ্যাডভোকেট ইকবাল বিন বাশার বলেন, “চাঁদপুর কণ্ঠের নিজস্ব পাঁচতলা বিশিষ্ট একটি আধুনিক কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। এটি কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি হবে না; এটি হবে চাঁদপুর কণ্ঠ পরিবারের সকল সদস্যের গর্ব ও ঐতিহ্যের প্রতীক। আট উপজেলার প্রতিনিধিদের সহযোগিতা, শুভানুধ্যায়ীদের সমর্থন এবং মহান আল্লাহর রহমতে আমরা এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করব, ইনশাআল্লাহ।”
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশেও চাঁদপুর কণ্ঠের অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছেন। ভবিষ্যতে কমপ্লেক্স নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ত করা হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে চাঁদপুর কণ্ঠের প্রধান সম্পাদক কাজী শাহাদাত সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে ফলোআপ রিপোর্টিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা অনেক সময় সংবাদ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ মনে করি। অথচ একটি সংবাদের সামাজিক প্রভাব, সংশ্লিষ্ট মানুষের অবস্থার পরিবর্তন কিংবা প্রশাসনের পদক্ষেপ সম্পর্কে অনুসন্ধান করে পরবর্তী সংবাদ প্রকাশ করাই প্রকৃত সাংবাদিকতার অন্যতম দায়িত্ব।”
তিনি অতীতের কয়েকটি ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ফলোআপ রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে অসহায় মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এবং সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।
কাজী শাহাদাত বলেন, “সংবাদপত্রের শক্তি শুধু সংবাদ প্রকাশে নয়, বরং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়নে। তাই আমাদেরকে আরও মানবিক, দায়িত্বশীল ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা চর্চা করতে হবে।”
তিনি বলেন, চাঁদপুর কণ্ঠ কখনো কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর মুখপত্র ছিল না এবং ভবিষ্যতেও হবে না। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধকে ধারণ করেই এর পথচলা অব্যাহত থাকবে।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “সবাই হয়তো প্রথম শ্রেণির সাংবাদিক হতে পারবে না, কিন্তু সবাই যেন ভালো সংবাদ লিখতে পারে এবং মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে, সেদিকে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। প্রযুক্তির এই যুগে নিজেকে দক্ষ করে তুলতে হবে এবং প্রিন্ট ও অনলাইন উভয় প্ল্যাটফর্মে সংবাদ প্রচারে আরও সক্রিয় হতে হবে।”
আলোচনা সভায় কৃষি কণ্ঠের বিভাগীয় সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুর রহমান, নারী কণ্ঠের বিভাগীয় সম্পাদক আবু সাঈদ কাউসার, সাংবাদিক মো. ফরিদ হাসান, প্রবীর চক্রবর্তী,আলমগীর তালুকদার, আরিফ বিল্লাহ, আব্দুল্লাহ আল মামুন, নাঈমুল ইসলাম কাজল, ডা. পীযূষ কান্তি, মির্জা জাকিরসহ চাঁদপুর কণ্ঠ পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা বলেন, চাঁদপুর কণ্ঠ শুধু একটি সংবাদপত্র নয়, এটি চাঁদপুরের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকতার মাধ্যমে পত্রিকাটি জেলার গণমানুষের আস্থা অর্জন করেছে।
পরে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ৩২ বছরের প্রতীকী কেক কাটা হয়। এ সময় প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রকাশক অ্যাডভোকেট ইকবাল বিন বাশার, প্রধান সম্পাদক কাজী শাহাদাত, মাহমুদা খানম মনুসহ চাঁদপুর কণ্ঠ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে পত্রিকার উন্নয়ন, প্রসার ও সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দেশে এবং বিদেশে সাংবাদিক দেরকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
দিনব্যাপী এই আয়োজন এক পর্যায়ে চাঁদপুর কণ্ঠ পরিবারের আবেগ, ভালোবাসা ও স্মৃতির মিলনমেলায় পরিণত হয়। বক্তারা পত্রিকাটির দীর্ঘায়ু, উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ধারাবাহিকতা কামনা করেন।
সকলের প্রত্যাশা, সত্য, সাহস ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থেকে আগামী দিনেও চাঁদপুর কণ্ঠ গণমানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে কাজ করবে এবং জেলার সাংবাদিকতার ইতিহাসে নতুন নতুন সাফল্যের অধ্যায় রচনা করবে।
ছবি : চাঁদপুর কন্ঠের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে প্রতিনিধিদপর মাঝে ক্রেস্ট বিতরন করছেন পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক অ্যাড.ইকবাল – বিন – বাশার
Leave a Reply