কিশোগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদ জামাতের আগে পুলিশ সদস্যদের ওপর বোমা হামলার বিবরণ পাওয়া গেছে প্রত্যক্ষদর্শী এক স্থানীয় বাসিন্দার জবানিতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় ওই বাসিন্দা কিশোরগঞ্জ শহরের একটি ব্যাংকে চাকরি করেন। প্রতিবারের মত এবারও ঈদের জামাতে অংশ নিতে ৭ জুলাই বৃহস্পতিবার সকালে তিনি শোলাকিয়া মাঠের উদ্দেশে রওনা হন।শোলাকিয়ার জামাত হওয়ার সময় ঠিক ছিল সকাল ১০টায়। আগেই পৌঁছে যাওয়ায় মাঠে না গিয়ে সকাল ৯টার দিকে রেললাইনের কাছে আজিমউদ্দিন হাইস্কুলের গেইটের পশ্চিম পাশে এক বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন ওই ব্যাংকার। “ওখান থেকে আনুমানিক ১০০ মিটার দূরে ইদগাহের দিকে যাওয়ার পথে চেকপোস্টে হঠাৎ পরপর দুটো বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল। আমি ধোঁয়া দেখলাম। কয়েকজন পুলিশ দেখলাম লুটিয়ে পড়ল।”হামলা হয়েছে বুঝতে পেরে কয়েক সেকেন্ড পর আতঙ্কে উল্টো দিকে ছুটতে শুরু করেন প্রত্যক্ষদর্শী এই যুবক।“আমি যখন দৌড়াচ্ছি, তখন পেছনে আরও কয়েকটা বোমা ফাটার আওয়াজ হল।”আজিমউদ্দিন হাইস্কুলের গেইটে ওই পুলিশ চেকপোস্ট থেকে আনুমানিক আড়াইশ মিটার দূরে শোলাকিয়া মাঠে উপস্থিত হাজারো মানুষের মধ্যেও তখন তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।কথা ছিল, বরাবরের মতোই মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ ঈদের জামাত পরিচালনা করবেন। কিন্তু এই গোলযোগের মধ্যে তিনি না পৌঁছানোয় শেষ পর্যন্ত স্থানীয় জামিয়া ইমদাদিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা শোয়াইবের ইমামতিতে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়।প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠে পুলিশ হামলাকারীদের ধরতে অভিযান শুরুকরলে উভয় পক্ষে গোলাগুলি শুরু হয়। তাতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তা হয়ে পড়ে জনশূন্য।
প্রত্যক্ষদর্শী ওই ব্যাংকার বলেন, সাধারণত স্কুলের গেইটের পথ দিয়েই তিনি প্রতিবছর শোলাকিয়া মাঠে যান ঈদের নামাজ পড়তে।বোমাবাজি শুরুর পর আমার আর সাহস হয়নি। এলাকায় ফিরে গিয়ে পাড়ার মসজিদে নামাজ পড়েছি,” বলেন তিনি।
দিনাজপুরের মাদ্রাসা ছাত্র ‘ওস্তাদের নির্দেশে’ শোলাকিয়ায় হামলা
শোলাকিয়ায় সন্ত্রাসী হামলার পর অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার দিনাজপুরের এক মাদ্রাসা ছাত্র র্যাবকে বলেছে, ‘ওস্তাদের নির্দেশে অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে’ সে কিশোরগঞ্জে আসে।
ঈদের সকালে দেশের সবচেয়ে বড় জামাতের আড়াইশ মিটার দূরে পুলিশের বোমা হামলার এই ঘটনায় দুই কনস্টেবল নিহত হন। পরে গোলাগুলির মধ্যে বাড়ির জানালা দিয়ে গুলি ঢুকে কেড়ে নেয় স্থানীয় এক গৃহবধূর প্রাণ। হামলার পর পুলিশের অভিযানের মধ্যে সন্দেহভাজন এক হামলাকারীও নিহত হন, যার ঢোলা পোশাকে অস্ত্র রাখার ‘বিশেষ পকেট’ থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
সন্দেহভাজন হামলাকারীদের মধ্যে দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ; আর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পিস্তলসহ র্যাবের হাতে ধরা পড়েন এক যুবক। র্যাব-১৪ এর মেজর সাইফুল সাজ্জাদ জানান, শফিউল ইসলাম ওরফে আবু মোকাদ্দেল নামের ১৯ বছর বয়সী ওই যুবককে তারা আহত অবস্থায় আটক করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছেন।“সে বলেছে তার বাড়ি দিনাজপুরর জেলা ঘোড়াঘাটে এবং সে মাদ্রাসার ছাত্র। সে আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিল, কিন্তু শেষ করে নাই।”তার সাথে যারা পাঁচজন ছিল, সে বলেছে, তাদের কে সে চেনে না।
শফিউল র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ওই হামলায় তার সঙ্গে আরও পাঁচজন ছিলেন, যাদের তিনি আগে থেকে ‘চিনতেন না’।“তাদের যে ওস্তাদ, সে তাদেরকে এখানে অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছে।”তবে সেই ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ ঠিক কী ছিল, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা এই র্যাব কর্মকর্তা দিতে পারেননি।সেই ‘আইইডি’এর আগে বিভিন্ন স্থানে জঙ্গিরা যে ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার করেছিল, শোলাকিয়াতেও তাই করা হয়েছে বলে র্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “জঙ্গিরা আইইডি (ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) ব্যবহার করে থাকে। এগুলো হাতে তৈরি এবং উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন। শোলাকিয়াতেও তাই হয়েছে।”এক সপ্তাহ আগে গুলশানের ক্যাফেতে জঙ্গি হামলার ঘটনাতেও আইইডি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে সে সময় সেনা সদর দপ্তর থেকে বলা হয়েছিল।
এছাড়া গতবছর ইমামবাড়ায় শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় যে হামলা হয়েছিল, হাতে তৈরি গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছিল সেখানেও।ওই দুই হামলাতেই জেএমবির জঙ্গিরা জড়িত বলে পুলিশের ভাষ্য।
সুত্র :বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Leave a Reply